এ জার্নি বাই ট্রেন

হুট করে ছোটোবেলার একটা ঘটনা মনে পড়লো। ২০০০ সালের ঘটনা, ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন, বি সেকশনে, বি এন কলেজ চট্টগ্রামে। কোনো একটা কারনে শুধু আমাদের সেকশনেই ইংলিশ ফার্স্ট পেপার আর সেকেন্ড পেপার দুটোই পড়াতেন সিথী ম্যাডাম। তো একদিন ম্যাডাম ক্লাসে সবাইকে Essay লিখতে দিলেন, ‘এ জার্নি বাই ট্রেন’। আমি মনের মাধুরী মিশিয়ে হাইস্কুলের জোড়াতালি দেওয়া ইংরেজীতে ঝটপট লিখে ফেললাম।

সেটা অনেকটা এরকম ছিলো, “ফ্যামিলি ভ্যাকেশনে চিটাগাং থেকে সিলেট যাচ্ছি, ট্রেনে করে। আমার জীবনের প্রথম ট্রেন জার্নি। তাই ট্রেনে উঠেই খুব শখ করে জানালার পাশের সিটটা দখল করে বসলাম। অপেক্ষা করছি কখন ট্রেন ছাড়বে, হাতের ক্যাসিও ঘড়িতে সময় দেখছি বারবার। ট্রেন তো আর ছাড়ে না !! এদিকে অপেক্ষা করতে করতে গরমে, মশায় ক্লান্ত হয়ে কিভাবে কিভাবে যেনো ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙে সকালে; উঠে দেখি ট্রেন থেমে আছে। আমরা সিলেট পৌছে গেছি। ব্যাস, আমার জার্নি বাই ট্রেন খতম।

আমার Essay টা পড়েই ম্যাডাম খুব রাগ করেছিলেন সেদিন। রিতীমত ডায়রীতে লিখে আমার প্যারেন্টস কল করেছিলেন। তিনি হয়ত ভেবেছিলেন, আমি মজা করেছি, বা ইচ্ছা করে এমনটা লিখেছি। আমি সেদিন বোঝাতে পারিনি আমার সাথে সত্যি সত্যিই এমনটা হয়েছিলো। ঐ বয়সের অভিমানটা খুব শক্ত টাইপের হয়। 🙂

অনেকবছর পরে যখন জীবনের প্রথম ইমেইল এড্রেস সাইন আপ করি, তখন সেফগার্ডের জন্য রিকোভারি মোবাইল নাম্বার বা ইমেইল এড্রেসের বদলে সিকিউরিটি কোশ্চেন আর আনসার ইনপুট করতে হতো। আমার মনে আছে আমি সিলেক্ট করেছিলাম,

“Who is your favourite childhood teacher?”

ফেরার পথে বেশ একটা মজা হলো। মেঘগুলো অনেকটা পথ পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছিলো। পথিমধ্যে হঠ্যাৎ রোঁদের সাথে দেখা। চা খাবার নাম করে তখন ঘুম তাড়াচ্ছিলাম। গতরাত টায় এক ফোঁটা চোখ বুজতে পারি নি। এক আকাশ ভরা তারা আর নতুন শীতের আদল, তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলো শুধুই।

এবারের মৌসুমটার শুরুতেই ঘাসে ঘাসে নতুন সবুজ মেখেছে। টিনের টুনা আর বিস্বাদ কফি টাও মুখে মানিয়ে গেছে বেশ। ত্রিশুলী’র বাঁক পেরুনোর আগেই গতবারের বুড়োটার সাথে ফের দেখা হয়েছিলো। গালে বাতাসের ঝাপটা আর ফাটা ঠোঁটে শীতের কামড় দেখেই উন্মাদটা বলে কি না, এবারের শীতটা গত দুই দশকের হাঁড় কাঁপিয়ে যাবে। কাল রাতে নেকড়েগুলো যখন হাঁক দিলো, তখনি মনে কুঁ ডাক দিয়েছিলো।

পাহাড় আমার কখনোই ভালো লাগে নি। সাগর আমাকে টানে। নোনা বাতাস, নীলসিয়া আসমান, মুক্তোদানার বালু, গভীর, অতল সে ডুব দুনিয়া, অজানা রহস্য প্রতি বাঁকে বাঁকে, থেকে থেকে এই রাখাল মন টাকে সূক্ষ্ম এক টান মারে। দুম করে হারিয়ে যাই ঐ অটল অজেয় সারির ঐ পাড়ে।
শুনেছি, পাহাড়ে মানুষ মিথ্যা বলে না।

কাঞ্চনজঙ্ঘা’র সাথে আমার গভীর অভিমান।

দার্জিলিং এ আমার প্রিয় হোটেলের নাম, হোটেল রিভলবার। জন, জর্জ, পল, রিঙো, ব্রায়ান – বাহারী তার রুমের নাম। মালবিকা’রা হানিমুনে কি এখানেই উঠেছিলো?

শিলিগুড়ি নেমে তেনজিং নরগে বাস স্টপ থেকে শেয়ারের জীপে করে সরাসরি এখানেই চলে এলাম। ইউনিয়ন চ্যাপেলের ঠিক পেছনেই, খুঁজে পেতে কোনো সমস্যাই হলো না। তার উপরে এবার সঙ্গী হিসেবে সাথে আছে কাউচসার্ফিং এর একজন লোকাল হোস্ট।

আমরা দুজন মিলে কিশোর মিত্র নামের সদা হাস্যজ্বল একজন কাল্পনিক চরিত্র কে খুঁজছি। কালিম্পং হয়ে রিসপ লাভা লোলে গাঁও, আর ফেরার পথে মিরিক আর ডুয়ার্সের চা বাগান। ব্যাস এতটুকুই প্ল্যান, থাকার ইচ্ছা আছে মোটামুটি সপ্তাহ খানেক। কিশোর মিত্রের চক্করে এবার ঘুম ঘোরে ভালোই ঘোরাঘুরি হবে বলে বোঝা যাচ্ছে।

“কেউ যদি কাউকে কিছু বলতে চায়, তবে কেউ যেনো স্কাইপে আসে।”

এমন দিনগুলোর কথা খুব পুরোনো কিন্তু নয়। আজকাল “আমার প্রিয় স্বপ্নগুলো”র সাথে মাঝে মাঝেই চলতি পথে দেখা হয়। সেন্ট্রাল এসি’র মল গুলোতে ঝকঝকে কাচের ওপাড়ে চোখ ধাধানো আলোর বন্যায় দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে যেগুলোকে হারিয়ে যেতে দিয়েছি, সেগুলোই আজাকাল বিজয় স্বরনীর সিগন্যাল গুলোতে একে একে জানালায় টোকা দেয়। হাই তুলি, সাড়া দেওয়া হয় না। কাচ নামাতে আলসেমি লাগে।

সেই সময়কার কথা, যখন কোনো কারন ছাড়াই দারুন দুরন্ত আনন্দে দিন কাটিয়েছি। এক একটা দিন, এক একটা রাত, একটা গোটা বিকেল, লোডশেডিং এর একটা পুরো ঘন্টা, কি কি না করেছি, কই কই না উড়ে বেড়িয়েছি। যাই চেয়েছি, তাই পেয়েছি, পাইনি, কিছুই যায় আসে নি। এত এত খেয়াল, ভালো লাগা, আগ্রহ, স্বপ্ন, প্রেম, গ্যাঞ্জাম, সারাদিন চরকির মত ঘোরা, বই পড়া, লুকিয়ে ইয়ে করা, স্কুল পালানো, টপকানো, হেটে হেটে কই থেকে কই কই যাওয়া, জুম্মা আড্ডা, তারাবীহ, শবে বরাত, শবে কদর, চান রাত, ট্যাপ টেনিস, বন্ধু, গ্যাঁজানো, গান, ভাঙা, গড়া, ভাই; আরও কত কত কি!

আজকাল কারো কারো চোখে সেই পুরোনো আমাকে দেখতে পাই। ফুড়ুৎ করে উড়ে যাই মেঘের দেশে।

বিদায় বিষাদের দিনগুলি; এই বেশ ভালোই আছি।

এই লাল নীল বাত্তির বোবা শহরে, সারাদিনের জোগালির পরে মধ্যবিত্ত বাড়ি ফেরায়, কখনো কখনো এই অভিশাপ বৃস্টি আশির্বাদ হয়ে ধরা দেয়। কাউকে জড়িয়ে ধরার লোভী সুযোগ করে দেয় ছাতা সামলানোর ছুতো। দানবীয় অন্ধকারে পিলে চমকানো হাইড্রোলিক হর্ন, কিংবা শহুরে মেঠোপথের চড়াই উতরাই, এক লেনের ভালোবাসায় তুচ্ছো হয়ে যায়।

বৃস্টির ছাটের আড়ালের নামে ময়লা পলিথিনের হুড, ক্লাস কামাই দেওয়া সোডিয়ামের বাতির কালো, খানা খন্দের গা ঘিন ঘিনে হ্রদ, উপচে পড়া দু পেয়ে নাগরিক বোঝাই বাসে, হেলপারের অসভ্য বাতচিত, ফ্লাইওভারে দশর্ক শ্রেনীর হায়েনাদের কনুই, থেমে থাকা এই শহরের কালো ধোয়া, সারাদিনের ক্লান্তি, পিপাসা, চায়ের নামে ঠান্ডা ধোয়া উঠা শরবত, বাসি বেনসন, উস্টা খাওয়া খুলে আসা মলিন শুকতালি, সবই যেনো বড় মধুর লাগে। চিরচেনা, অনেক অনেক আপন।

সব কূল ছাপিয়ে, কোলাহলের কুয়াশা ভেদ করে, বিলবোর্ড, সাইনবোর্ডে সয়লাব হয় কারো কারো মুখ, অক্ষরে অক্ষরে, বর্নমালায়, আকাবুকি আর কাটাকুটি হয়ে যায় মান অভিমান, আধকপালি, প্রিয় মুখ, প্রিয় সুখ। এক পাগলীর প্রেমে, হন্য হয়ে ফেরে কেউ কেউ।

তোমাদের এই নগরে।

সকাল টা হোক, এমনটাই। ঐ ব্যালকনির খোপ দিয়ে, ঐ ঘুঘলির রোশনি বলে যাক, আয়, আরেকটি বার আয়। রাতপ্রভাত আড়মোড়া ভাঙুক অসহ্য সে সুখে। বদলে যাক মুঠোফোনের আচল। রিক্সা, সিএনজি’র বৃস্টিতে জানান থাকুক দ্বিতীয়তম আনন্দের। অপেক্ষার গুনগুনানিতে আজ পাল তুলুক পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবির গান।

একটা বার আসুক না সে, প্রশ্রয়ে;
থাকুক না হয় এ বেলা।
চেনাপথের ভ্রমণসঙ্গী হোক চির অচেনা কেউ।

বারে বারে বন্ধু তোমায় দেখতে মন চায় ~~**

গতদিনের সন্ধ্যা অবধি ঘুম, বৃস্টির সাথে প্রেমের আগেই ছাড়াছাড়ি করিয়ে ছিলো। সেই বিরহ কাটতে না কাটতেই আজ ভোর থেকেই শুরু হলো অসীমের কোপাকুপি কান্না, সাথে ভারী বর্ষন আর বিকট ঘুরুম ঘুরুম। সেই তুমুল ছাটে আমার আপন আধার, ঘর দুয়ার, বিছানার চাদর আর বাউন্ডুলে পাখি ফুড়ুৎ মন, সব ছাপিয়ে বিছিয়ে আকুল ব্যাকুল ঘরপোড়া, উথাল পাথাল দুলুনিতে বেহায়া মুন্না ভাই এমবিবিএস এর গান, কোল্ড প্লে আর ঈদের নাটকে এনে ফেললো।

ঝটপট কিছু মোটিভেশনাল ভিডিও আর হারিয়ে ফেলা আমি, ব্রুনো মার্সের তালে তালে প্রশ্রয় পেলো বৃস্টি বিলাশের। ফুলবানু’স রিভেঞ্জ, মহীনের ঘোড়াগুলি ছুটে গেলো নৈঋত কোনে, লঙ্কা জয়ে। আর তাইতো কাউকে দেখা গেলো কাদাজলে, দাপ্তরিক ব্যস্ততায়, আড়িপাতায়, রিকশা রথে, এই শহুরেরই কতিপয় চেনামুখ মাড়িয়ে, হাসিমুখের অন্বেষণে। সাথে তো ছিলোই গুনগুনিয়ে আর্কের তিন টেক্কা, মনে সুখের বান। পিপড়াবিদ্যার আসরে কাল থেকে নতুন মুখের উপস্থিতি আর বেলা শেষে উপহার চায়ের কাপে সন্ধ্যা চুমু।

এই বেশ ভালোই আছি।

শেষবেলায় বিদায় মুহুর্তটা কেনো যেনো কখনোই মনের মত হয় না। প্রতিবারই হয়ত কোনো একটা বিশেষ না বলা কথা, প্রিয়মুখ টা শেষ আরেকটা বার দেখার আকুতি, আক্ষেপ; কিংবা হয়ত সেই দোলনচাঁপা গুলোর গন্ধ নেবার উছিলা, শহুরে ভীড়ে একা দাঁড়িয়ে দেখা মন টা কে দুমড়ে মুচড়ে দেয়।

ইভটিজিং এর চৌরাস্তায়, দুই রিক্সার সরু গলিতে, ভীড় ঠেলা তার সকুচিত ভীরু হারিয়ে যাওয়া দেখার লোভী সুযোগ করে দেয় তখন গলির মাথার পানের দোকানগুলো। বেনসনের ভাংতি খোঁজার ছুতোয়, সেই ঘোলা সোডিয়ামের আলো তখন কি এক পাশ ফেরা, তারা জ্বল জ্বল সুখী মুখের, রুপের সত্যিই কি মিথ্যা দ্বন্দে ফেলে দেয়। মায়া বাড়ায়, রাত বাড়ে, সমান তালে।

তাই তো এই মুমুর্ষ নগরীর শেষ ট্রিপের বলাকা বাসের ভাঙা জানালার ঘোলা কাঁচে, কেউ কেউ লিখে আসে, লাজুক সে কথা। ধুলো আর বিষাক্ত বাতাসে সারাদিনের ক্লান্তিতে হেলানো, বুজে আসা চোখ, তখনো আশ্চর্য এক সুখ খুঁজে পায়, কারো কারো পাঠানো আকস্মিক এসএমএস এ।মাঝরাতে বাড়ি ফেরা, মধ্যবিত্ব মনটা গেয়ে যায় পুরোনো দিনের বাংলা ছবির গান।

কেউ না জানুক কার কারনে।

Cómo es ella ?

Ella es alta, bonita y tiene un buen sentido de humor

প্রতিবারের মত আজকের দেখা হওয়াটাও আনকোরা ছিলো। প্রতিবারের মত আজকেও তাই মেঘগুলো বলে দিলো, প্রেম কর, প্রেম কর। প্রতিবারের মত আজকেও নিয়মকরে ঘড়ি দেখা হলো না। প্রতিবারের মতন আজকেও তাই বেলাশেষের আচারের পাস্তা আর নদীর ঐপাড়ের শিক-চা বিশ্বজয় করল।

ট্রাস্টের ঘোড়াগুলোও আজ পানের দোকান ধরে সার বেধে দাঁড়িয়ে ছিলো, মাহুতের অপেক্ষায়। বিকেল টা চৌরাস্তার সিগন্যালে এসে ঠাই দাঁড়িয়ে গেলো গল্প শেষের অপেক্ষায়। আর গল্প তো প্রারম্ভিকা পেরুতেই হিমসিম খাচ্ছিলো বাসার রিনিঝিনি তে। ঈর্ষা সুখে দিনগুলো তাই প্রশ্রয়ের প্রশংসায় সন্ধ্যা দীপ জ্বেলে গেলো।

কেবল মৌসুমি হাওয়াটাই জানিয়ে গেলো, তার সনে আজই যে প্রথম দেখা।